যৌতুকের কালোয় ছায়ার ছোবলে খুন গৃহবধূ, আসামিরা এখনো ধরা-ছোঁয়ার বাইরে!
জাহাঙ্গীর আলম , বিশেষ প্রতিনিধি | ২২ মার্চ ২০২৬
যৌতুকের দাবিতে এক গৃহবধূকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে তার স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের বিরুদ্ধে। হত্যার পর ঘটনাটি আত্মহত্যা হিসেবে দেখাতে মুখে বিষ ঢেলে প্রমাণ নষ্টের চেষ্টারও অভিযোগ রয়েছে। ঘটনার এক মাস পেরিয়ে গেলেও মামলার কোনো আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় এলাকায় ক্ষোভ বাড়ছে, আর ভুক্তভোগী পরিবার বলছে—ন্যায়বিচার এখনো অধরাই।
নিহত গৃহবধূ মোছাম্মৎ সাদিয়া আক্তার মাহি (মাহিদা) হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার ছাতিয়াইন ইউনিয়নের পিয়াইম গ্রামের বাসিন্দা। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে তিনি নাসিরনগরের খান্দুরা গ্রামের মোহাম্মদ আহাম্মদ আলী ওরফে আবুলের সঙ্গে পালিয়ে বিয়ে করেন। পরবর্তীতে আদালতে এফিডেভিটের মাধ্যমে বিয়েটি বৈধতা পায়। দাম্পত্য জীবনে তাদের একটি আট মাস বয়সী ছেলে সন্তান রয়েছে—আরাফাত।
পরিবারের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই মাহিদার ওপর পাঁচ লাখ টাকা যৌতুকের জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয়। স্বামী, দেবর, শ্বশুরসহ পরিবারের কয়েকজন সদস্য নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালাতেন বলে অভিযোগ করেন তার স্বজনরা। বিষয়টি মাহিদা একাধিকবার তার বাবার পরিবারকে জানিয়েছিলেন বলেও দাবি করা হয়েছে।
গত ২৩ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ১১টার দিকে মাহিদার বাবা দিয়ারিশ মিয়া মেয়ের খোঁজ নিতে শ্বশুরবাড়িতে গেলে ঘরে মেয়ের মরদেহ দেখতে পান। তার দাবি, মাহিদার গলার পাশে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন, গলায় ফোলা জখম এবং মুখে ফেনা দেখা যায়—যা তাকে হত্যাকাণ্ডের ইঙ্গিত দেয়। তিনি অভিযোগ করেন, “আমার মেয়েকে হত্যা করে পরে মুখে বিষ ঢেলে আত্মহত্যা বলে চালানোর চেষ্টা করা হয়েছে।”
আরও গুরুতর অভিযোগ হলো—ঘটনার পর মাহিদার আট মাস বয়সী সন্তান আরাফাতকে নিয়ে অভিযুক্তরা পালিয়ে যায়। এক মাস পেরিয়ে গেলেও শিশুটির অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি বলে পরিবার দাবি করেছে।
এ ঘটনায় প্রথমে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) এবং পরে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করা হয়। মামলায় মোট ১২ জনকে আসামি করা হয়েছে। তবে অভিযোগ উঠেছে, এখনো পর্যন্ত কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
ভুক্তভোগীর পরিবারের অভিযোগ, আসামিরা প্রকাশ্যে এলাকায় অবস্থান করলেও পুলিশ কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না। এমনকি তদন্তে গাফিলতি ও প্রভাবশালীদের সঙ্গে আঁতাতেরও অভিযোগ তুলেছেন তারা।
নিহতের বাবা দিয়ারিশ মিয়া বলেন, “আমার মেয়েকে মেরে ফেলেছে, নাতিকেও নিয়ে গেছে। আমরা কি বিচার পাব না? এক মাস হয়ে গেল, কেউ ধরা পড়ল না।”
অন্যদিকে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নাসিরনগর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সুমন চন্দ্র দাস অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “নিহতের স্বজনরা তদন্তে যথাযথ সহযোগিতা করছেন না। তারা চাইলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করে অন্য কর্মকর্তাকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারেন।”
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযোগ প্রমাণিত হলে এ ঘটনায় বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩০২ ধারা (খুন), ২০১ ধারা (অপরাধের প্রমাণ নষ্ট), ৩৪ ধারা (সম্মিলিত অপরাধ) এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ অনুযায়ী কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। পাশাপাশি যৌতুক নিরোধ আইনেও ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, বিষয়টি অবিলম্বে বিশেষ নজরদারিতে এনে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত প্রয়োজন। বিশেষ করে শিশুসন্তান নিখোঁজের বিষয়টি মানবাধিকার ও শিশুর নিরাপত্তার দিক থেকেও গুরুতর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে, ঘটনার এক মাস পার হলেও আসামিদের গ্রেপ্তার না হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। দ্রুত গ্রেপ্তার ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের শাস্তির দাবি জোরালো হচ্ছে।