পাঁচবিবিতে কাগজে-কলমে গাইনী চিকিৎসক, বাস্তবে ঢাকায় — ঝুঁকিতে প্রসূতি সেবা
মোঃ মাসুম রেজা
জয়পুরহাট প্রতিনিধি
জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কাগজে-কলমে গাইনী ও প্রসূতি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক কর্মরত থাকলেও বাস্তবে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকায় চরম বিপাকে পড়েছেন গর্ভবতী নারী ও প্রসূতি মায়েরা। জরুরি সময়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা না পেয়ে ঝুঁকি নিয়েই অন্য হাসপাতালে ছুটতে হচ্ছে রোগীদের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক দীর্ঘদিন ধরে রাজধানী ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে কর্মরত থাকায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের গাইনী বিভাগ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। ফলে প্রতিনিয়ত দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সেবা নিতে আসা রোগীদের।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ৫০ শয্যার এই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়মিতভাবে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি রোগী ভর্তি থাকেন। প্রতিদিন আউটডোরে প্রায় ৭০০ রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। এত বিপুল রোগীর চাপ থাকা সত্ত্বেও গাইনী ও প্রসূতি বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবা কার্যত বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হয়ে উঠছে।
ডেলিভারি করাতে আসা রোগীর স্বামী রিপন ইসলাম বলেন, “আজ সকাল সাড়ে আটটার দিকে আমার স্ত্রীকে নিয়ে হাসপাতালে আসি। ভর্তি করার প্রায় ২০ মিনিটের মধ্যেই নরমাল ডেলিভারি সম্পন্ন হয়। তবে এখানে কোনো গাইনী বিশেষজ্ঞ না থাকায় মাঝে মাঝে সমস্যায় পড়তে হয়। একজন গাইনী ডাক্তার থাকলে আমরা আরও নিশ্চিন্ত থাকতে পারতাম।”
চিকিৎসা নিতে আসা মণিরা বলেন, “আমি অনেক আশা নিয়ে এখানে চেকআপ করতে এসেছি। কয়েকবার চিকিৎসাও নিয়েছি। কিন্তু প্রয়োজনীয় সুবিধার অভাব রয়েছে। বিশেষ করে গাইনী ডাক্তারের খুব প্রয়োজন। বাধ্য হয়ে আমাদের বাইরে যেতে হয়, যা খুব কষ্টকর।”
হাসপাতালের নার্সিং সুপারভাইজার ফরিদা ইয়াসমিন জানান, “৫০ শয্যার হাসপাতাল হলেও প্রতিদিন ৫০-৬০ জন রোগী ভর্তি থাকে। গাইনী ডাক্তারের অভাবে রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে আমাদের হিমশিম খেতে হয়। অনেক সময় রোগীরা সিজারিয়ান সুবিধা না থাকায় অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হন। আগে এখানে সিজার বেশি হতো, এখন সেই সুবিধা কমে গেছে।”
মিডওয়াইফ কর্মী রিমা বলেন, “প্রতিমাসে এখানে গড়ে ৪৫-৫০টি নরমাল ডেলিভারি হয়। পিএনসি সেবা দেওয়া হয় ৫০-৬০ জনকে এবং এএনসি সেবা পান ৩০০-৪০০ জন। কিন্তু গাইনী ডাক্তার না থাকায় রোগীরা পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারেন না। জটিলতা দেখা দিলে রোগীদের জয়পুরহাটে রেফার করতে হয়। এখানে একজন গাইনী কনসালট্যান্ট নিয়োগ দেওয়া জরুরি।”
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট গাইনী চিকিৎসক ডা. রেজওয়ানা শারমিন বলেন, “আমার পোস্টিং পাঁচবিবিতে ছিল, তবে বর্তমানে আমার প্রমোশন হয়েছে। আমি এখন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর হিসেবে কর্মরত। শিগগিরই নতুন পোস্টিং দেওয়া হবে।”
পাঁচবিবি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শ্রী তপন কুমার পাল বলেন, “আমাদের এখানে গাইনী চিকিৎসক পোস্টিং থাকলেও তিনি কর্মস্থলে উপস্থিত নেই। ফলে বিশেষজ্ঞ সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার জানানো হয়েছে।”
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত একজন গাইনী ও প্রসূতি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পদায়ন করে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পূর্ণাঙ্গ সেবা নিশ্চিত করা হোক, যাতে প্রসূতি মা ও নবজাতকের জীবন ঝুঁকি কমে আসে।